ফ্রান্সের পৌর নির্বাচন
প্রথম দফার ভোটে এগিয়ে বামপন্থীরা, চোখ এখন দ্বিতীয় দফায়ফ্রান্সের পৌর নির্বাচন
নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ১৬ মার্চ ২০২৬ ১৫:৪১
প্রথম দফার ভোটে এগিয়ে বামপন্থীরা, চোখ এখন দ্বিতীয় দফায়
রোববার ফ্রান্সে ২০২৬ সালের পৌরসভা বা মিউনিসিপ্যাল নির্বাচনের প্রথম দফা ভোট হয়েছে। তবে পৌর প্রশাসনের নেতৃত্বে কারা আসছেন, সেটি জানতে অপেক্ষা করতে হবে দ্বিতীয় দফা ভোটের জন্য। দ্বিতীয় দফা ভোট হবে ২২ মার্চ রোববার।
ফ্রান্সে পৌরসভা নির্বাচনে ভোট হয় দুই ধাপে। প্রথম দফার ফলাফলে জঁ লুক মেলনশোর অতি বাম রাজনৈতিক দল লা ফ্রঁন্স আনসুমিজ (এলএফই) এবং মারিন লো পেনের কট্টর ডান ন্যাশনাল র্যালী (আরএন) কয়েকটি শহরে শক্তিশালী অগ্রগতি দেখিয়েছে। অন্যদিকে পরিবেশবাদী দল (ইকোলোজিস্ট) কিছু গুরুত্বপূর্ণ শহরে ভালো করতে পারেনি।
দেশজুড়ে ৩৪ হাজার ৮৭৫টি কমিউন বা শহরে প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৫৬ শতাংশ। এটি ২০২০ সালের তুলনায় অনেক বেশি হলেও ২০১৪ সালের নির্বাচনের তুলনায় কম। বড় শহরগুলোতে অনিশ্চয়তা: ফ্রান্সের কয়েকটি বড় শহরে প্রথম দফার ফলাফল অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে এবং দ্বিতীয় দফার ফলাফল নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
প্যারিসে ফরাসি সোশ্যালিস্ট পার্টি (পিএস) এবং বাম দলগুলোর জোটের প্রার্থী এমানুয়েল গ্রেগোয়া প্রথম দফায় এগিয়ে রয়েছেন প্রায় ৩৭.৯ শতাংশ ভোট নিয়ে। ডানপন্থি লে রিপাবলিকান (এলআর)-সমর্থিত প্রার্থী রাশিদা দাতি পেয়েছেন প্রায় ২৫.৫ শতাংশ ভোট। লা ফ্রঁন্স আনসুমিজ (এলএফই)-এর প্রার্থী সোফিয়া শিকিরু প্রায় ১২ শতাংশ ভোট নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছেন এবং দ্বিতীয় দফায় বামপন্থি জোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। ফলে প্যারিসে চার প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
দ্বিতীয় বৃহত্তম লিও শহরেও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা লক্ষণীয়। পরিবেশবাদী দলের (ইকোলোজিস্ট) বর্তমান মেয়র গ্রেগরি দুশে এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী জ্যঁ-মিশেল আউলাস উভয়েই প্রায় ৩৬.৮ শতাংশ ভোট পেয়ে সহাবস্থানে রয়েছেন। মার্সেই শহরে ফরাসি সোশ্যালিস্ট পার্টির (পিএস)-বর্তমান মেয়র বেনোয়া পায়াঁ সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন কট্টর ডান ন্যাশনাল র্যালীর (আরএন) প্রার্থী ফ্রঁ আলিসিওর বিরুদ্ধে। তাদের ভোটের ব্যবধান খুবই কম। যথাক্রমে প্রায় ৩৫.৬ শতাংশ এবং ৩৫.১ শতাংশ।
লিল শহরেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হয়েছে। সেখানে ফরাসি সোশ্যালিস্ট পার্টির (পিএস) প্রার্থী অল্প ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও লা ফ্রঁস আনসুমিজর (এলএফই) প্রার্থী খুব কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছেন। পরিবেশবাদী দল (ইকোলোজিস্ট) তৃতীয় স্থানে রয়েছে।
এলএফইর উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি
প্রথম দফার নির্বাচনে অতি বাম রাজনৈতিক দল লা ফ্রঁস আনসুমিজর (এলএফই) উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে। দলটির নেতারা এটিকে তাদের জন্য বড় রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছেন। দলটির নেতা জঁ লুক মেলনশো বিশ্বজুড়ে পরিচিত মুখ। মার্কিন-ইসরায়েল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী এবং চীন-রাশিয়া ঘনিষ্ট এই নেতাকে নিয়ে মূল ধারার রাজনীতিতে চাপা অস্বস্তি রয়েছে। উত্তর ফ্রান্সের রুবে শহরে এলএফইর প্রার্থী ডেভিড গিরো প্রায় ৪৬ শতাংশ ভোট পেয়ে এগিয়ে রয়েছেন এবং দ্বিতীয় দফায় জয়ের সম্ভাবনা তৈরি করেছেন।
উত্তর প্যারিসের আলোচিত শহর সাঁ ডেনিসে এলএফই শক্ত অবস্থানে রয়েছে এবং সেখানে প্রথম দফাতেই জয় পেয়েছে দলটির পুরো প্যানেল। দলটির নেতৃত্ব দ্বিতীয় দফায় ডানপন্থী ও কট্টর ডান শক্তিকে ঠেকাতে এন্টি-ফ্যাসিস্ট কোয়ালিশন তৈরি করে বামপন্থী দলগুলোকে জোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছে।
পিএস ও এলএফই জোট নিয়ে মতবিরোধ
তবে সোশ্যালিস্ট পার্টি (পিএস) জাতীয় পর্যায়ে এলএফইর সঙ্গে জোট করার ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছে। দলটির নেতৃত্ব বলেছে যে এলএফই বামপন্থীদের নেতৃত্ব দিয়ে বিজয়ের পথে নিয়ে যেতে সক্ষম নয় এবং তাই জাতীয় পর্যায়ে তাদের সঙ্গে কোনো চুক্তি হবে না।
পরিবেশবাদীদের চ্যালেঞ্জ
২০১৯-২০২০ সময়ে ফ্রান্সে ‘সবুজ ঢেউ’ তৈরি করেছিল পরিবেশবাদী দল (ইকোলোজিস্ট)। কিন্তু এবার বেশ কয়েকটি শহরে তারা কঠিন অবস্থায় পড়েছে। জার্মান সীমান্তবর্তী স্ট্রসবুর্গ শহরের বর্তমান পরিবেশবাদী মেয়র পিছিয়ে রয়েছেন প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে। বোর্দো শহরেও পরিবেশবাদী প্রার্থী এগিয়ে থাকলেও ব্যবধান খুবই কম। লিল শহরে তারা তৃতীয় স্থানে নেমে গেছে।
ডানপন্থীদের অবস্থান
ডানপন্থি লে রিপাবলিকানের (এলআর) নেতৃত্ব দ্বিতীয় দফার আগে ‘ডানপন্থিদের বড় ঐক্য’ গঠনের আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে বামপন্থী জোট এবং কট্টর ডান ন্যাশনাল র্যালীর (আরএন) বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে প্রজাতন্ত্রপন্থী ডানপন্থীদের ঐক্য জরুরি। অন্যদিকে কট্টর ডান ন্যাশনাল র্যালীও (আরএন) দ্বিতীয় দফার আগে ডানপন্থি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সঙ্গে সমঝোতার আহ্বান জানিয়েছে।
ফ্রান্সে পৌর নির্বাচনের ভোট পদ্ধতি
ফ্রান্সে মেয়র ও পদে কাউন্সিলর পদে সরাসরি ব্যক্তিগতভাবে ভোট দেওয়া হয় না, যেমনটি কিছু অন্যান্য দেশে দেখা যায়। ভোটাররা আলাদাভাবে প্রতিটি কাউন্সিলর প্রার্থীর জন্য ভোট দেন না। পৌরসভা নির্বাচনের সময় নাগরিকরা একটি পূর্ণাঙ্গ প্রার্থী তালিকার পক্ষে ভোট দেন। এই তালিকা সাধারণত মেয়র প্রার্থীর নেতৃত্বে তৈরি করা হয় এবং এতে একাধিক প্রার্থী থাকেন, যার মধ্যে মেয়র প্রার্থীও অন্তর্ভুক্ত থাকেন। প্রতিটি তালিকা যে পরিমাণ ভোট পায়, তার অনুপাতে পৌর পরিষদের আসন বণ্টন করা হয়। ফলে তালিকায় যে প্রার্থীরা নির্দিষ্ট ক্রমে অন্তর্ভুক্ত থাকেন, তারা সেই ক্রম ও প্রাপ্ত ভোটের অনুপাত অনুযায়ী নির্বাচিত হন। অর্থাৎ, কাউন্সিলররা সরাসরি ব্যক্তিগত ভোটে নয়, বরং পুরো তালিকার প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন। পরে গঠিত পৌর পরিষদের সদস্যরা নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে মেয়র হিসেবে নির্বাচন করেন।
আছেন বাংলাদেশিরাও: মেয়র পদে কোনো বাংলাদেশি প্রার্থী না থাকলেও এবারের নির্বাচনে বৃহত্তর প্যারিসের বিভিন্ন শহরে প্রার্থী হয়েছেন অনেক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফরাসি নাগরিক।
তাদের মধ্যে নাহিদুল মোহাম্মদ নামে একজন উত্তর প্যারিসের সাঁ ডেনিস শহর থেকে অতি বাম এলএফই দলের প্যানেল থেকে কাউন্সিলর পদে নির্বাচিত হয়েছেন। অর্থাৎ তাদের প্যানেল প্রথম দফায় ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করায় সেখানে দ্বিতীয় দফার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে না। নাহিদুল বর্তমানে প্যারিসের সর্বন বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত এবং তার পৈত্রিক নিবাস বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ জেলায়।
নাহিদুল মোহাম্মদ বলেন, ‘ফ্রান্সের স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের অভিবাসী বংশোদ্ভূত নাগরিকদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। এই নির্বাচনে বিজয় আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা এবং এটি স্থানীয় সমাজে বাংলাদেশি কমিউনিটির উপস্থিতিকে আরও দৃশ্যমান করবে।’
ভোটার উপস্থিতি
প্রথম দফায় ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৫৬ শতাংশ। এটি ২০২০ সালের মহামারিকালীন নির্বাচনের তুলনায় বেশি হলেও ২০১৪ সালের তুলনায় কম। তবে প্যারিস, লিয়োঁ ও স্ট্রাসবুর্গের মতো বড় শহরে ভোটারদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।
নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, দ্বিতীয় দফার ভোটে দেশটির বেশ কয়েকটি বড় শহরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে যাচ্ছে। তাই চূড়ান্ত ফলাফল নিয়ে ভবিষ্যদ্বানী কঠিনই বটে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: