ঢাকা | মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৭ মাঘ ১৪৩২

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি হচ্ছে সোমবার, কতটা সুবিধা পাবে বাংলাদেশ?

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:৩৭

ছবি: সংগৃহীত


জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। এমন এক সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক-সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তি সই করতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) ওয়াশিংটন ডিসিতে এই চুক্তিটি সইয়ের কথা রয়েছে।

তবে নির্বাচন-পূর্ব এই তাড়াহুড়ো, চুক্তির শর্তাবলি গোপন রাখা এবং অংশীজনদের পর্যাপ্তভাবে সম্পৃক্ত না করার অভিযোগ— সব মিলিয়ে চুক্তিটি ঘিরে দেশে তৈরি হয়েছে সংশয় ও সন্দেহ।

প্রধান প্রশ্ন একটাই, এই চুক্তি থেকে বাংলাদেশ আসলে কতটা সুবিধা পাবে? নাকি নির্বাচনের মুখে একটি অস্থায়ী সরকার এমন এক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যার দায়ভার বইতে হবে ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকারকে?

নির্বাচন সামনে রেখে তাড়াহুড়ো কেন?

১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ভোটের মাত্র তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমাত্রিক প্রভাবসম্পন্ন চুক্তি সইয়ের উদ্যোগ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে রাজনৈতিক মহল, ব্যবসায়ী সমাজ ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে।

অনেকে মনে করছেন, বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত ছিল— এ ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে দেওয়া। কারণ, এই চুক্তির বাস্তবায়ন, পুনরায় আলোচনা বা সংশোধনের দায়িত্ব ভবিষ্যৎ সরকারকেই নিতে হবে।

রাজনৈতিক নেতাদের একটি অংশের আশঙ্কা— দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে কোনও একতরফা শর্ত মেনে নেওয়া হলে, পরবর্তী সরকার চাইলে তা পরিবর্তন করতে গিয়ে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক জটিলতায় পড়তে পারে।

শুল্ক কমার আশ্বাস, কিন্তু কতটা?

বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন জানিয়েছেন, সোমবারের চুক্তিতে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক আরও কমানোর চেষ্টা চলছে। তবে কতটা কমবে— তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

তিনি জানিয়েছেন, সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে শুল্কহার নির্ধারণের বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।

রবিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন শেখ বশিরউদ্দীন। তিনি এ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বেও রয়েছেন।

শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, “৯ তারিখে যে চুক্তিটি হতে যাচ্ছে, সেখানে আমরা চেষ্টা করছি শুল্ক আরও কতটা কমানো যায়। কতটুকু কমবে, এই মুহূর্তে আমি বলতে চাচ্ছি না বা পারছি না। আলোচনার ভিত্তিতে বিষয়টি নির্ধারিত হবে।”

তিনি বলেন, ‘‘শুধু সামগ্রিক শুল্ক কমানো নয়, বাংলাদেশের প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতে শুল্ক শূন্যে নামিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।’’

“আমাদের প্রচেষ্টা রয়েছে— গার্মেন্টস পণ্যে যেন শুল্ক শূন্য হয়। আমরা এখনও সেই লক্ষ্যে কাজ করছি,” বলেন তিনি।

পটভূমি: পাল্টা শুল্ক থেকে দরকষাকষি

২০২৫ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশসহ প্রায় ১০০টি দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। শুরুতে বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক ধার্য করা হলেও পরে আলোচনা ও দরকষাকষির মাধ্যমে তা ২০ শতাংশে নামিয়ে আনে অন্তর্বর্তী সরকার— যা গত ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়। এর সঙ্গে আগে থেকেই থাকা ১৫ শতাংশ শুল্ক যোগ হয়ে বর্তমানে বাংলাদেশি পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মোট শুল্কহার দাঁড়িয়েছে ৩৫ শতাংশ।

চুক্তির শর্ত প্রকাশ হওয়ায় বাংলাদেশ বিব্রত অবস্থায় পড়েছিল উল্লেখ করে শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, “৩৭ শতাংশ শুল্ক আমরা নেগোশিয়েট করে ২০ শতাংশে নামিয়েছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই চুক্তির শর্ত ফাঁস হয়ে যায়। পৃথিবীতে একমাত্র দেশ হিসেবে আমাদের চুক্তির শর্ত বিশ্বজুড়ে প্রকাশিত হয়। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সেটা না হলে আমরা ২০ শতাংশেরও কম শুল্ক পেতাম।”

তিনি আরও বলেন, “তারপরও আমরা আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে শুল্ক কমিয়ে আনতে পেরেছি।”

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ৬২৬টি পণ্যে শুল্ক ছাড় ঘোষণা করে, যার মধ্যে ১১০টি পণ্যের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়। তবে এতেও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে বড় পরিবর্তন আসেনি।

শুল্কচাপ কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের দাবির আলোকে বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসে বাংলাদেশ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মার্কিন প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনা এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম, সয়াবিন তেল ও তুলা আমদানি বাড়ানো।

বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনা প্রসঙ্গে বেসামরিক বিমান পরিবহন উপদেষ্টা বলেন, “বর্তমানে আমাদের হাতে ১৯টি উড়োজাহাজ থাকলেও বাস্তবে ফ্লাইয়েবল আছে ১৪টি। এই ১৪টি প্লেন দিয়ে আমাদের নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতে হচ্ছে। বিমানের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী ২০৩৫ সাল নাগাদ আমাদের অন্তত ৪৭টি উড়োজাহাজ প্রয়োজন।”

তিনি জানান, বোয়িং ও এয়ারবাস—দুই প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব বিশ্লেষণ করে টেকনো-ইকোনমিক ফিজিবিলিটি সম্পন্ন করা হয়েছে। এরপর প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদকে প্রধান করে একটি নেগোশিয়েশন টিম গঠন করা হয়, যা বর্তমানে বোয়িংয়ের সঙ্গে দরকষাকষি করছে।

শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, “আমরা যে উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাব করছি, সেটি ২০৩৫ সাল পর্যন্ত মাত্র ১৪টি প্লেনের জন্য। এর মূল্য পরিশোধ হবে দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে— ১০ বছর বা প্রয়োজনে ২০ বছর সময় নিয়ে।”

তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বার্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার বা ৭০-৮০ হাজার কোটি টাকা।

“যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তুমি আমার কাছ থেকে যতটা রফতানি করো, তার তুলনায় অনেক কম আমদানি করছো। এটা তারা অন্যায্য হিসেবে দেখছে,” বলেন তিনি।

শেখ বশিরউদ্দীন আরও বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের রফতানি আয় একলাখ কোটি টাকার বেশি। আর যে উড়োজাহাজ কেনার কথা হচ্ছে, তার মোট মূল্য ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে পরিশোধ করা হবে।”

উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এয়ারবাস থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত থাকলেও রাজনৈতিক পরিবর্তন ও যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকার বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত ৩০ ডিসেম্বর বিমানের পরিচালনা পর্ষদ বোয়িং থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার অনুমোদন দেয়। এর মধ্যে রয়েছে ৮টি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, ২টি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং ৪টি বোয়িং ৭৩৭-৮ মডেলের উড়োজাহাজ।

‘গোপন’ চুক্তি ও নন-ডিসক্লোজার বিতর্ক

চুক্তিটি ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্কের জায়গা হলো এর গোপনীয়তা। গত বছরের ১৩ জুন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট (এনডিএ) সই করে বাংলাদেশ। এর ফলে শুল্ক চুক্তির আলোচনার শর্তাবলি প্রকাশ করা যাচ্ছে না।

ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, যেসব খাত সরাসরি এই চুক্তির প্রভাবের মধ্যে পড়বে, তাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, “আমরা জানিই না চুক্তিতে কী আছে। নির্বাচনের ঠিক আগে এমন সিদ্ধান্ত না নিলেই ভালো হতো।”

আমদানি বাড়ানোই কি মূল শর্ত?

সরকার ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম, সয়াবিন তেল, তুলা ও কৃষিপণ্য আমদানি বৃদ্ধি, এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা ও

বোয়িং থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বার্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার।

বিশ্লেষকদের প্রশ্ন— শুল্ক কমার বিনিময়ে যদি এসব আমদানি বাড়াতে বাধ্য করা হয়, তাহলে তা দেশের শিল্প, কৃষি ও বাজার কাঠামোর ওপর কী প্রভাব ফেলবে?

অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ

সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, চুক্তির মূল বিষয়গুলো অন্তত রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক অংশীজনদের জানানো উচিত ছিল।

তিনি বলেন, “যারা ভবিষ্যতে এই চুক্তি বাস্তবায়ন করবে, তারা যদি কিছুই না জানে— তাহলে জবাবদিহি থাকবে কোথায়?” সিপিডির আরেক সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, “এটি শুধু একটি শুল্ক চুক্তি নয়; এর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। অথচ স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে।”

ভবিষ্যতে কি পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে?

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন ফ্রেমওয়ার্ক অ্যাগ্রিমেন্ট (টিকফা) প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ভবিষ্যতে এই চুক্তি নিয়ে পুনরায় আলোচনা করা সম্ভব।

তবে সেটি কার্যকর হবে কিনা, তা নির্ভর করবে চুক্তির ভাষা ও শর্তের ওপর। যদি কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদি বাধ্যবাধকতা যুক্ত থাকে, তাহলে নতুন সরকারের জন্য তা সহজ হবে না।

এই চুক্তি সুবিধা না ঝুঁকি?

সরকারের দাবি, এই চুক্তি হলে বাংলাদেশ শুল্ক সুবিধা পাবে, রফতানি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকবে এবং মার্কিন বাজারে অবস্থান শক্ত হবে। অপরদিকে ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকদের শঙ্কা— গোপন শর্ত, নির্বাচনের আগে তাড়াহুড়ো এবং অংশীজনদের বাদ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সোমবারের চুক্তি তাই শুধু একটি বাণিজ্যিক দলিল নয়— এটি হয়ে উঠেছে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার এক বড় পরীক্ষাও।

বাংলাদেশ আসলে কতটা সুবিধা পাবে— নাকি নতুন সরকারের হাত-পা আগেই বাঁধা পড়ে যাবে। এর উত্তর মিলবে চুক্তির শর্ত প্রকাশের পরই। কারণ, গোপনীয়তার আড়ালে থাকা এই চুক্তির ভালো-মন্দ নির্ধারণের সুযোগ এখনও দেশবাসীর সামনে খোলা হয়নি।




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Developed with by DATA Envelope
Top