প্রশাসকের ওপর হামলা
সেই কারখানার রাস্তা কেটে দিল সিটি করপোরেশন
নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ৩ আগস্ট ২০২৬ ২৩:৩৩
রাজধানীর উত্তরখানে একটি কারখানায় যাওয়ার রাস্তা কেটে দিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)।
এই কারখানার সামনে ময়লা ফেলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান ও স্থানীয় সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের ওপর গতকাল রোববার (২ আগস্ট) হামলা হয়েছিল।
কারখানাটির নাম নেপচুন অ্যাকসেসরিজ সলিউশন। এটি রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার জন্য বিভিন্ন উপকরণ তৈরি করে। গতকালের ঘটনার পর কারখানাটি বন্ধ রয়েছে।
আজ সোমবার গিয়ে দেখা যায়, কারখানার সামনের রাস্তাটি কাটা। খনন করা মাটি পাশে স্তূপ করে ফেলে রাখা হয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটির অঞ্চল-৮-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা আ ন ম বদরুদ্দোজা প্রথম আলোকে বলেন, ওই স্থানে পানিনিষ্কাশনের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই একটি নালা নির্মাণের প্রয়োজন ছিল। কারখানা কর্তৃপক্ষের বাধার কারণে কাজটি করা যাচ্ছিল না।
আ ন ম বদরুদ্দোজা বলেন, গতকালের ঘটনার পর কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ায় সড়ক কেটে নালা নির্মাণ শুরু করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, এক সপ্তাহের মধ্যেই সড়কটি মেরামত করা হবে।
কারখানার ভেতরে গিয়ে দায়িত্বশীল কাউকে পাওয়া যায়নি। তবে কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে কথা হলে তাঁরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কারখানার মালিকপক্ষের ভোগান্তি তৈরি করতেই রাস্তা কেটে দেওয়া হয়েছে।
ময়লা ফেলা নিয়ে দ্বন্দ্ব
নেপচুন অ্যাকসেসরিজ নামের কারখানাটি ঢাকা উত্তর সিটির ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাধীন উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায়। কারখানাটির সামনেই উত্তর সিটির একটি অস্থায়ী বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র (এসটিএস) রয়েছে। সেটি নির্মাণ করা হয় ২০২৩ সালে।
কারখানায় প্রবেশের একমাত্র সড়ক এসটিএস ঘেঁষেই। কারখানার কর্মীদের সূত্রে জানা গেছে, এই এসটিএসে রাখা ময়লার দুর্গন্ধের কারণে কারখানায় কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ক্রেতারাও এ নিয়ে আপত্তি করেছে। বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষ আদালতে গিয়ে ওই এসটিএসে ময়লা রাখার ওপর নিষেধাজ্ঞা পায়।
কারখানার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুটি ছবি দেখান। ছবিতে দেখা যায়, এসটিএসের সামনে একটি ব্যানার ঝোলানো। সেখানে লেখা, উচ্চ আদালতের আদেশ অনুযায়ী উত্তরখান মৌজার রাজাবাড়ী গণকবরস্থানের পাশের বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশনের সংস্কার ও ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এই ব্যানার আজ ছিল না।
কারখানার গ্রাফিকস বিভাগের এক কর্মীর দাবি, আদালতের ওই আদেশের পর এসটিএসের ভেতরে ময়লা না ফেলে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা ইচ্ছাকৃতভাবে কারখানার সামনের সড়কেই ময়লা জমা করতে শুরু করেন। এতে দুর্গন্ধ ছড়ানোর পাশাপাশি কারখানায় যাতায়াতও ব্যাহত হতো। বহুবার আপত্তি জানানো হলেও অবস্থার পরিবর্তন হয়নি বলে তাঁর অভিযোগ।
আজ দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, কারখানার সামনের সড়কেই ময়লার স্তূপ করা হয়েছে। বেলা আড়াইটার দিকে আরও দুটি পিকআপ এবং ইঞ্জিনচালিত দুটি ভটভটি থেকে সড়কের ওপর ময়লা ফেলতে দেখা যায়। এতে কারখানার প্রবেশপথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
এ বিষয়ে এসটিএসের কর্মী হাসমত আলী প্রথম আলোকে বলেন, আদালতের আদেশের কারণে এসটিএসের ভেতরে ময়লা ফেলা যাচ্ছে না। তাই আপাতত সরকারি সড়কের অংশে ময়লা জমা করা হচ্ছে। পরে রাতে ডাম্প ট্রাকে করে সেগুলো আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে নেওয়া হয়।
কী হয়েছিল সেদিন
উত্তর সিটি, কারখানা ও পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, গতকাল সকালেও কারখানার সামনের সড়কে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা ময়লা ফেলছিলেন।
সে সময় কারখানার একজন ব্যবস্থাপক ওই দৃশ্যের ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে গেলে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা তাঁকে বাধা দেন। এ নিয়ে ধাক্কাধাক্কি ও বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে নিরাপত্তাকর্মীরা অন্য শ্রমিকদের ডাকেন। পরে উভয় পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।
এদিকে বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান ও ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন।
সূত্র জানিয়েছে, তাঁদের সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় নেতা-কর্মীরা। প্রশাসক ও সংসদ সদস্য যখন কারখানার মালিকপক্ষকে বিষয়টি নিয়ে জিজ্ঞাসা করছিলেন, তখন উত্তেজনা তৈরি হয়।
উত্তরের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম ও সংসদ সদস্য জাহাঙ্গীরের পরিদর্শনের সময় হামলা
কারখানার কর্মীদের দাবি, কারখানার মালিককে হেনস্তা করা হচ্ছিল। এ সময় কারখানা থেকে শ্রমিকেরা বেরিয়ে আসেন এবং তাঁকে রক্ষা করেন।
অন্যদিকে ডিএনসিসি বলছে, প্রশাসক ও সংসদ সদস্যের ওপর পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে। গতকাল ডিএনসিসির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গেলে প্রশাসক ও সংসদ সদস্যের উপস্থিতিতেই মালিকপক্ষের ‘ভাড়াটে সন্ত্রাসী’রা অতর্কিত হামলা চালায়।
উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাবিবুর রহমান আজ প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনায় ডিএনসিসি বাদী হয়ে মামলা করেছে। এখন পর্যন্ত ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মধ্যরাতে কাটা হয় রাস্তা
প্রশাসক ও সংসদ সদস্যের ওপর হামলার ঘটনার পর রাতে কারখানার সামনের রাস্তা কাটা হয়।
সেখানকার নির্মাণাধীন একটি ভবনের দুই শ্রমিক প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল দিবাগত রাত সাড়ে ১২টা থেকে ১টার মধ্যে সিটি করপোরেশনের একটি এক্সক্যাভেটর (খননযন্ত্র) দিয়ে সড়কটি কাটা হয়েছে।
রাজধানী ঢাকায় আধুনিক সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) নির্মাণের উদ্যোগ শুরু হয় ২০১৩ সালে। তবে জমি অধিগ্রহণ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের আপত্তির কারণে প্রকল্পের অগ্রগতি ধীর ছিল।
২০১৫ সালে উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে আনিসুল হকের দায়িত্ব নেওয়ার পর এসটিএস নির্মাণ ও সম্প্রসারণে গতি আসে। ২০১৬ সালে উত্তর সিটিতে ৩৯টি এসটিএস চালু ছিল এবং আরও ৯টির নির্মাণ চলছিল।
এসটিএসে মূলত অস্থায়ী ভিত্তিতে বাসাবাড়ি থেকে আনা ময়লা-আবর্জনা জমা করে রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে ডাম্প ট্রাক, কনটেইনার ক্যারিয়ার কিংবা কম্পেক্টরে করে ওই বর্জ্য স্থায়ী বর্জ্য স্থানান্তরকেন্দ্র বা ল্যান্ডফিলে নেওয়া হয়। ঢাকা দুই সিটিতে, উত্তরে আমিনবাজারে এবং দক্ষিণে মাতুয়াইলে ল্যান্ডফিল রয়েছে।
নগর–পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান প্রথম আলোকে বলেন, পরিকল্পিতভাবে এসটিএস স্থাপিত না হওয়ায় সিটি করপোরেশন বিকল্প জায়গা বেছে নিয়েছে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রভাব ও উপযোগিতা যাচাই করা হয়নি। তাঁর মতে, রাজউকের মাস্টারপ্ল্যানের সঙ্গে সমন্বয় করে আগেই উপযুক্ত স্থান নির্ধারণ করা উচিত ছিল।
আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, প্রয়োজনে ভূমি অধিগ্রহণ করে হলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় এসটিএস স্থাপন করতে হবে, যাতে জনভোগান্তি ও স্থানীয় বিরোধ এড়ানো যায়।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: