উৎসবের অপেক্ষায় দেশ
নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ২৪ জুন ২০২২ ১৩:৫৬

খরস্রোতা পদ্মার দুই পাড় যুক্ত করেছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু। দেশের সবচেয়ে দীর্ঘ এ সেতুর নির্মাণকাজ এরই মধ্যে শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। গত বুধবার রাতেই সেতু বিভাগকে তা বুঝিয়ে দিয়েছে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সেতুতে যান চলাচলের জন্য যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষাও শেষ হয়েছে। চলাচলের জন্য এখন সম্পূর্ণ প্রস্তুত পদ্মা সেতু। নিজেদের অর্থায়নে নির্মিত এ সেতুর উদ্বোধনী ক্ষণকে ঘিরে সারা দেশের মানুষের মধ্যে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। আবেগের, গর্বের, অহংকারের এ সেতু উদ্বোধনের আয়োজনেও রয়েছে ব্যাপকতা।
সবকিছু ঠিক থাকলে আগামীকাল শনিবার সকাল ১০টায় বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সেতুর উদ্বোধন করবেন। শেষ মুহূর্তে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ঘিরে চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। সেতু উদ্বোধনের পর দুই প্রান্তে আয়োজিত সমাবেশে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দিন সকাল ১০টায় হেলিকপ্টারে পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তে এসে উপস্থিত হবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মাওয়া প্রান্তে সেতুর উদ্বোধনী ফলক উন্মোচন করে অংশ নেবেন সুধী সমাবেশে। এরপর সেখান থেকে সেতু পার হয়ে শরীয়তপুর প্রান্তে আয়োজিত দলীয় জনসভায় অংশ নেবেন। পদ্মা সেতুর আদলেই তৈরি করা হয়েছে যে জনসভার মঞ্চ। মঞ্চের ঠিক সামনে পানিতে ভাসতে থাকবে বিশাল আকৃতির একটি নৌকা। তার পাশে ১১টি পিলারের ওপর ১০টি স্প্যান বসিয়ে তৈরি করা হয়েছে মঞ্চ। দেখে মনে হবে সেতুর পাশ দিয়ে বড় একটি নৌকা চলছে।
মাওয়া প্রান্তের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন বিদেশি কূটনীতিকসহ দেশবরেণ্য সুধীজনরা। সমাবেশের দৃষ্টিনন্দন মঞ্চ তৈরিসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনার কাজ শেষ করতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন কর্মীরা। পদ্মা সেতুর নিরাপত্তার মূল দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।
জেলা প্রশাসন ও আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের পর বাংলাবাজার ফেরিঘাট এলাকার জনসভায় যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ জনসভাকে স্মরণীয় করে রাখতে প্রায় ১৫ একর জমির ওপর ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। যেখানে তৈরি করা হয়েছে ১৫০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৪০ ফুট প্রস্থের বিশাল মঞ্চ। নিরাপত্তার জন্য মঞ্চের ভেতরে ও বাইরে বসানো হয়েছে ছয়টি ওয়াচ টাওয়ার। থাকবে দেড় শতাধিক সিসিটিভি ক্যামেরা।
প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে এ জনসভায় ১০ লাখ মানুষের সমাগম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সভাস্থলে ৫০০ অস্থায়ী শৌচাগার, ভিআইপিদের জন্য আরও ২২টি শৌচাগার, সুপেয় পানির লাইন, ৪০ শয্যার তিনটি অস্থায়ী হাসপাতাল, নারীদের বসার আলাদা ব্যবস্থা এবং প্রায় দুই বর্গকিলোমিটার আয়তনের সভাস্থলে দূরের শ্রোতাদের জন্য ২৬টি এলইডি মনিটর ও ৫০০ মাইকের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া নদীপথে আসা মানুষের জন্য ২০টি পন্টুন তৈরি করা হচ্ছে।
মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক রহিমা খাতুন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে জনসভায় ১০ লাখ মানুষের সমাগম হবে। পানি থেকে শুরু করে তাদের সব ধরনের সুবিধা দিতে আমরা প্রস্তুতি নিয়েছি। এছাড়া সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় পরীক্ষামূলকভাবে টোল দিয়ে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের কয়েকটি গাড়ি পার হয়। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ওইদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে মাওয়া প্রান্তের টোলপ্লাজায় টোল দিয়ে সেতু প্রকল্পের কয়েকটি গাড়ি পদ্মা সেতু পার হয়। তবে দেশের পরিবহনগুলোতে প্রযুক্তির ব্যবহার না থাকায় আপাতত সনাতন পদ্ধতিতে টোল দিয়েই সেতু পার হতে হবে বলে জানিয়েছে কর্র্তৃপক্ষ।
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সেতুর মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তের সব ল্যাম্পপোস্টের বাতি একসঙ্গে প্রজ¦ালন করা হয়। এতে পুরো পদ্মা সেতু আলো ঝলমলে হয়ে ওঠে। রাতের আঁধার নেমে আসতেই সড়কবাতির ঝলকে আলোকিত হয়ে উঠে প্রমত্তা পদ্মাও।
প্রশাসন থেকে জানানো হয়েছে, আজ শুক্রবার সকাল থেকে রবিবার পর্যন্ত সেতুর সঙ্গে সংযুক্ত সড়ক ও মহাসড়কে কাভার্ড ভ্যান এবং ট্রাক চলাচল নিষিদ্ধ করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) জনসংযোগ ও গণমাধ্যম শাখার উপকমিশনার ফারুক হোসেন এক খুদেবার্তায় এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি আরও জানান, ঢাকা মহানগরী এলাকা থেকে মুন্সীগঞ্জের মাওয়াগামী কাভার্ড ভ্যান ও ট্রাকগুলোকে আগামী ২৪ জুন সকাল থেকে ২৬ জুন সকাল পর্যন্ত পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া এবং চাঁদপুর-শরীয়তপুর রুটে ফেরিতে চলাচলের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
উদ্বোধন ঘিরে ত্রিমাত্রিক নিরাপত্তা বলয় : পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে সার্বিক নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকবে র্যাবসহ পাঁচ হাজার পুলিশ সদস্য। সাজানো হয়েছে ত্রিমাত্রিক নিরাপত্তা বলয়। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপপ্রচার রোধে গ্রহণ করা হয়েছে সর্বোচ্চ নজরদারির ব্যবস্থা। সার্বিক নিরাপত্তা বিবেচনায় শুধু পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ঘিরেই নয়, নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে রাজধানীসহ সারা দেশেই।
ইতিমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে দেশের প্রতিটি থানায় নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ পাঠিয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকতে বলা হয়েছে। গুজব-অপপ্রচার রোধে বাড়ানো হয়েছে সাইবার মনিটরিং। আকাশপথের নিরাপত্তায় র্যাবের এয়ার উইং কাজ করবে। নৌপথে থাকবে নৌ-পুলিশ। মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও মুন্সীগঞ্জ জেলা পুলিশের চাহিদা মোতাবেক যদি আরও ফোর্স লাগে তাহলে তাও দেওয়া হবে। একই সঙ্গে কাজ করছে হাইওয়ে পুলিশ।
মাদারীপুর জেলার পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেল বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে নিরাপত্তা পরিকল্পনা গুরুত্ব দিয়ে প্রণয়ন করা হয়েছে। সব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ চলছে। এরই মধ্যে সাদা পোশাকে নিরাপত্তা বাহিনী মাঠে কাজ করছে।’
উদ্বোধনী দিনে উৎসবে মাতবে ৬৪ জেলা : পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান একযোগে সারা দেশে দেখানো হবে। দেশের ৬৪ জেলা উৎসবে মাতবে এ উদ্বোধনী দিনে। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হবে। এ উপলক্ষে আগামীকাল থেকে ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুরসহ কয়েকটি জেলায় পাঁচ দিন পর্যন্ত বিভিন্ন অনুষ্ঠান চলবে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকার হাতিরঝিলে লেজার শোর আয়োজন করা হবে। গত শুক্রবার বিকেলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উদ্যোগে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকে পদ্মা সেতু উদ্বোধন উদযাপনে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়। এর আগে গত ১ জুন সারা দেশে একযোগে পদ্মা সেতুর মূল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দেখানোর ব্যবস্থা করতে সব ডিসিকে চিঠি দেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
পোস্টার, তোরণ, ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে শিবচর : মাদারীপুরের শিবচর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, পদ্মা সেতুর উদ্বোধন ঘিরে শিবচরে সর্বস্তরে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। রাস্তাঘাট, হাটবাজার ও অলিগলি পোস্টার, ব্যানার আর বিলবোর্ডে ছেয়ে গেছে। বাংলাবাজার ঘাট এলাকাসহ আশপাশের তিন কিলোমিটার এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করাসহ নানা সাজে সজ্জিত করা হয়েছে। প্রায় সবখানেই লেগেছে রঙের ছোঁয়া। ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের শিবচরে পাচ্চর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার এলাকায় প্রায় ২০টি তোরণ, বড় বড় ব্যানার ও ছয় হাজার ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে গোটা সড়ক ও জনসভাস্থলের আশপাশ। এছাড়া বিভিন্ন সড়কের ডিভাইডার ও জনসভাস্থলসহ দুপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকাতে সাত দিন আগে থেকেই আলোকসজ্জা করা হয়েছে। শিবচর উপজেলা পরিষদ ভবনসহ সরকারি দপ্তরগুলো, হাটবাজার এবং বিভিন্ন এলাকা নান্দনিক সাজে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। শিবচর উপজেলা থেকে প্রায় এক লাখ লোক সমাগমের চেষ্টা চলছে জনসভাস্থলে। তাই ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে চলছে আওয়ামী লীগের দলীয় বৈঠক, আলোচনা সভা, মিছিল, গণসংযোগ ও মাইকিং।
উদ্বোধনের আগেই দর্শনার্থীদের ভিড় : উদ্বোধনের আগেই স্থানীয় মানুষ ভিড় জমাচ্ছে বাংলাবাজার ঘাটে। প্রতিদিন দুপুর থেকেই স্থানীয় লোকজনের ভিড় বাড়ছে ঘাট এলাকায়। জনসভা ঘিরে উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে তাদের ভেতর। কেউ সেলফি তুলছেন, কেউবা আবার নিজের ফেইসবুকে লাইভ দিয়ে মঞ্চ দেখাচ্ছেন দেশবাসীকে। মাদারীপুর পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেল বলেন, ‘জনসভা ঘিরে আমাদের প্রস্তুতির কোনো কমতি নেই। আমরা এসএসএফের সঙ্গে আলোচনা ও তাদের দিকনির্দেশনায় কাজ করে যাচ্ছি।’
মুন্সীগঞ্জের লৌহজং প্রতিনিধি জানান, ‘আমাদের টাকায় আমাদের সেতু, বাংলাদেশের পদ্মা সেতু’ এ সেøাগানকে সামনে রেখে স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধন উপলক্ষে মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাটে আনন্দ শোভাযাত্রা করেছে বাংলাদেশ ট্যুরিস্ট পুলিশ। গতকাল বিকেল ৫টার দিকে শিমুলিয়া ঘাট থেকে এ শোভাযাত্রা বের হয়ে বিভিন্ন স্থান প্রদক্ষিণ করে।
সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে তৈরি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় স্থাপনা পদ্মা সেতু। সেতুটির দৈর্ঘ্য ৬.১৫ কিলোমিটার। দ্বিতল এ সেতুর এক অংশ পদ্মা নদীর মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্ত এবং অন্য অংশ নদীর শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে যুক্ত। একই সঙ্গে ট্রেন ও গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা রয়েছে এ সেতুতে। চার লেনবিশিষ্ট ৭২ ফুট প্রস্থের এ সেতুর নিচতলায় রয়েছে রেললাইন। এর মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ স্থাপিত হবে। পদ্মা সেতু নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মূল সেতুর পাইলিং ও নদীশাসনের কাজ উদ্বোধন করেন। এরপর একে একে সব ধাপ পেরিয়ে পদ্মার বুকে ৪২টি পিলারের ওপর দৃশ্যমান হয়ে উঠে স্বপ্নের সেতু। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ সেতু চালু হলে বাংলাদেশের জিডিপি ১.২ থেকে ১.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: