ঢাকা | শনিবার, ৫ এপ্রিল ২০২৫, ২২ চৈত্র ১৪৩১
দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা ফেব্রুয়ারিতে

সংস্কার প্রতিবেদন হবে নতুন বাংলাদেশের সনদ: প্রধান উপদেষ্টা

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ১৬ জানুয়ারী ২০২৫ ০৫:০৯

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস

অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত চার সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘এসব প্রতিবেদন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে আমরা যা গঠন করতে চাচ্ছি, তার উদ্দেশ্য এ থেকে গণ–অভ্যুত্থানের একটা চার্টার (সনদ) তৈরি করা, যা হবে নতুন বাংলাদেশের সনদ। এটা মতৈক্যের ভিত্তিতে তৈরি হবে। নির্বাচন হবে, সবকিছু হবে, কিন্তু সনদ থেকে সরে যাওয়া যাবে না।’

 

গতকাল বুধবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে চার সংস্কার কমিশনের সদস্যরা প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন। এ সময় অধ্যাপক ইউনূস সংস্কার কমিশনের সদস্যদের উদ্দেশে এ কথাগুলো বলেন। সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, দুর্নীতি দমন ও পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন গতকাল প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এদিকে চার সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে গতকাল বিকেলে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আগামী মাস থেকে সরকারের আলোচনা শুরু হবে।

সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন বাংলাদেশি ও বাঙালি জাতির একটা সনদ উল্লেখ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘এ সনদ আমরা বুকে নিয়ে অগ্রসর হব। যত দ্রুত পারি, যত বেশি এটা বাস্তবায়ন করতে পারি, করতে থাকব। ভবিষ্যতে যে নির্বাচন হবে, এটাও হবে এই সনদের ভিত্তিতে। সেটাও যেন ঐকমত্যের সরকার হয় (পরবর্তী সরকারও যেন বলে) যে সনদ আমরা ধরে রেখেছি। যত কিছুই হোক, এটা যেন হাত থেকে ছেড়ে না দিই। তা না হলে এই স্বপ্নের যে সংযোগ, সেটি থাকবে কী করে! আমরা সেই স্বপ্নের সংযোগ চাই, বাস্তবায়ন চাই।’

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘এই চার্টার থেকে যাবে ইতিহাসের অংশ হিসেবে। এটা আমাদের জাতীয় কমিটমেন্ট (প্রতিশ্রুতি)। এটা কোনো দলীয় কমিটমেন্ট নয়। আমরা আশা করছি, সব দল এই চার্টারে সাইনআপ (অংশগ্রহণ) করবে।’

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘নির্বাচন এই চার্টারের একটা অংশ হবে এবং ঐকমত্যের নির্বাচন হবে। তা না হলে চার্টার হারিয়ে যাবে। কাজেই এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটা শুধু একটা আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটা এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। বহু ধরনের বৈঠক হয়, রিপোর্ট (প্রতিবেদন) প্রকাশ হয়, আনুষ্ঠানিকতা হয়; কিন্তু আজকের আনুষ্ঠানিকতা সেগুলোর অনেক ঊর্ধ্বে। আজকের এ ঘটনা ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। কারণ, ইতিহাসের প্রবাহ থেকেই এই কমিশনগুলোর সৃষ্টি হয়েছে।’

 

একটা ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতির হঠাৎ পুনরুত্থান হয়েছে, মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে মন্তব্য করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘সেখান থেকেই ইতিহাসের সৃষ্টি, আজকের এই অনুষ্ঠান সেই ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এসব বিচ্ছিন্ন কোনো প্রতিবেদন নয়। আজ যে প্রতিবেদনগুলো আমরা হাতে নিলাম, অবশ্যই এটা আমাদের দেশের জন্য বড় একটি চর্চা। কেউ সেটা অস্বীকার করবে না।’

সংস্কার কমিশনের সদস্যদের অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘আমরা একটা নতুন বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন নিয়ে তার কাঠামো তৈরি করার কাজ আপনাদের হাতে দিয়েছিলাম। স্বপ্ন আছে এখনো, সেই স্বপ্নের রূপরেখাগুলো তুলে ধরতে হবে। এটা শেষ নয়, একটা অধ্যায়ের শুরু হলো। স্বপ্ন ও অভ্যুত্থান–পরবর্তী তার যে যাত্রা, সেটা শুরু হলো। এর বড় একটি অংশ এই প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হবে যে আমরা কী করতে চাচ্ছি। এর মাধ্যমে আমরা সবার সঙ্গে আলোচনা শুরু করব।’

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘সবার সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়ে মতৈক্য হবে। সেটা না হলে আমরা কী স্বপ্ন দেখলাম? আমরা নিজেরা স্বপ্ন দেখলাম, আর সেই স্বপ্নে মানুষের অংশ নেই, সেটা তো হতে পারে না। আমরা সেই স্বপ্নের কতটুকু এখানে নিয়ে এসেছি, সেটার জন্যই এই আলোচনা। এটি বাইরে থেকে চাপানো কোনো জিনিস নয়, ভেতর থেকে উদ্ভূত একটা জিনিস।’ আগামী দিনে মতৈক্য প্রতিষ্ঠার জন্য যে আলোচনা হবে, সেখানে কমিশনের সদস্যরাই নেতৃত্ব দেবেন বলেও জানান অধ্যাপক ইউনূস।

দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা ফেব্রুয়ারিতে

সংস্কার কমিশনগুলোর দেওয়া সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আগামী মাস থেকে সরকারের আলোচনা শুরু হবে। চার সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়া নিয়ে গতকাল বিকেলে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এ তথ্য জানান। এ সময় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, কমিশনগুলোতে সমন্বয়সহ আনুষঙ্গিক কাজের জন্য এক মাস সময় দেওয়া হয়েছে। তবে জানুয়ারির মধ্যেই এই চার কমিশনসহ মোট ছয়টি সংস্কার কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জানিয়ে দেওয়া হবে। বাকি দুটি কমিশন হলো বিচার বিভাগ সংস্কার ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন।

সরকারের পক্ষ থেকে আগেই বলা হয়েছে, সংস্কার কমিশনগুলোর প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রস্তাবগুলো নিয়ে সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে। কবে থেকে এ আলোচনা শুরু হবে—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘যেহেতু কমিশনপ্রধানেরা এক মাস সময় চেয়ে নিয়েছেন, তাঁরা নিজেরা বসে প্রাধান্যগুলো ঠিক করবেন। আমার ধারণা, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে হয়তো আলোচনা শুরু করা যাবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে একধরনের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। তারা তাদের লিখিত মতামত দিয়েছে।’

এ বিষয়ে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, কমিশন যদি কাজ আগে শেষ করতে পারে, তাহলে হয়তো ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু হতে পারে।




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Developed with by DATA Envelope
Top