ঢাকা | রবিবার, ৬ এপ্রিল ২০২৫, ২৩ চৈত্র ১৪৩১

পথে পথে পদে পদে ভোগান্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ৯ জুলাই ২০২২ ০৫:৪৭

পথে পথে পদে পদে ভোগান্তি

ঈদের আগে শেষ কর্মদিবস বৃহস্পতিবার অফিস ছুটি হলে সবাই বাড়ি ছুটবে সেটাই স্বাভাবিক। সেদিন জনস্রোতের ঢেউয়ে ভোগান্তি হতে পারে ভেবে পরদিন (শুক্রবার) বাড়ি ফেরার পরিকল্পনা করেন হেদায়েত হোসেন। পরিকল্পনা মতো সকাল ৮টায় বাসা থেকে বের হন তিনি, যাবেন গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম।

নতুন বাজারের বাসা থেকে রাস্তায় নেমেই প্রথম ধাক্কা খেলেন হেদায়েত। নতুন বাজার স্টপেজে গাড়ির জন্য দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য মানুষ। এদের মধ্যে অনেক নারী-শিশুও দেখা যায়। সঙ্গে ব্যাগ-লাগেজ দেখেই বোঝা যায় সবার গন্তব্য বাড়ি। কিন্তু গাড়ি কোথায়? যাও মাঝেমধ্যে দুই-একটা আসছে সেগুলোও গেটলক করে। কেউ নামলে নামতে পারছে, কিন্তু কাউকে উঠতে দেওয়া হচ্ছে না। দু-একজন দৌড়ে পড়ি-মরি করে উঠলেও হেলপাররা তাদের আগেই বলে দিচ্ছেন ‘টিটিপাড়া, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী যেখানেই যান ১০০!’ এর মানে এখান থেকে উঠলেই এখন বাস ভাড়া ১০০ টাকা! অথচ সাধারণত নতুন বাজার থেকে টিটিপাড়া-সায়েদাবাদের ভাড়া ২৫-৩০ টাকা। সড়কে গণপরিবহন কমে যাওয়ায় এবং যাত্রীর চাপ থাকায় মানুষকে জিম্মি করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে তিনগুণ ভাড়া।

হেদায়েতের মতো গাড়ির অপেক্ষায় দাঁড়ানো নাজিম উদ্দিন তখন বলছিলেন, ‘দেখছেন কারবার? ৩০ টাকার ভাড়া ১০০ টাকা নেয় কীভাবে? কেউ কি এসব দেখার আছে? অথচ এভাবে বাড়তি ভাড়া নিলে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে জরিমানা করার কথা।’ নাজিম উদ্দিন যাবেন সদরঘাট। ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহনের সদরঘাটগামী একটা গাড়ি আসতে দেখেই দৌড়ে গেলেন। হেলপারের (চালকের সহকারী) সঙ্গে ছুটতে ছুটতেই বাহাস করে গাড়িতে উঠে পড়লেন তিনি।

তবে তখনো হেদায়েত তার টিটিপাড়ার গন্তব্যের গাড়ির জন্য অপেক্ষা করে আছেন। ২০ মিনিট, ৩০ মিনিট, ৪০ মিনিট, এভাবে ঘণ্টা গড়িয়ে যায়। গাড়ি এলেও গেটলক। দুই-একটা সিএনজি অটোরিকশার চালকের সঙ্গে কথা বললেন। মানুষের বিপদে এই বাহনের চালকদের যে পোয়াবারো হয়, সেটা আরেকবার চাক্ষুষ করলেন হেদায়েত। ২০০-২৫০ টাকার ভাড়া চালকরা চাইছিলেন ৪০০-৪৫০ টাকা।

jagonews24

হেদায়েত অগত্যা বাসের অপেক্ষায় থাকাটাই মনস্থির করলেন। এর মধ্যে এলো অনাবিল পরিবহনের একটি বাস। একজন যাত্রী নামলেন, ভেতর থেকে অন্য যাত্রীদের সাফ হুঁশিয়ারি, ‘আর যাত্রী নিবা না!’ হেদায়েত হেলপারকে বলতে থাকেন, ‘আর যাত্রী না নিলে আমরা যাবো কীভাবে?’ অনেকটা মানিয়ে গাড়িতে উঠতে সমর্থ হন হেদায়েত। গাড়ি ছুটতে থাকলো বাড্ডা, রামপুরা, খিলগাঁও, বাসাবো পেরিয়ে। কমলাপুরে সংলগ্ন সড়কে আসতেই আর এগোয় না বাস।

সামনে পশুর হাট আর দূরপাল্লার বাসের কাউন্টারের চাপ। এতদূর দাঁড়িয়ে আসতে আসতে পা ধরে আসছিল, তাই হেদায়েত গাড়ি থেকে নেমে হাঁটা ধরলেন। ভ্যাপসা গরম, সঙ্গে ব্যাগ-লাগেজ, কষ্ট হলেও বাড়ি যাওয়ার আনন্দে তা উবে যাচ্ছিল। হেদায়েতের চৌদ্দগ্রাম হয়ে যায় ঢাকা-ফেনী রুটের বাস স্টার লাইন পরিবহন।

শোনা গেছে, বৃহস্পতিবার স্টার লাইন কাউন্টারে টিকিটের জন্য এত ভিড় ছিল যে কয়েক দফায় যাত্রীদের সঙ্গে বাহাসও হয়েছে। ঈদে ফেনীমুখী টিকিটের যে চাহিদা তৈরি হয়, তা মেটাতে বরাবরই হিমশিম খাচ্ছে স্টার লাইন। কিন্তু এবারের চিত্র সবকিছু ছাড়িয়ে গেছে। শুক্রবার হেদায়েত যখন স্টার লাইনের টিটিপাড়া কাউন্টারে ঢুঁ মারলেন, তখনো কয়েকশ মানুষ টিকিটের অপেক্ষায়। কিন্তু কাউন্টারের কর্মীরা বারবার বলে যাচ্ছেন, ‘গাড়ি নেই, টিকিট নেই। গাড়ি আসতে পারছে না, রাস্তায় প্রচুর জ্যাম।’ বেলা ১১টায়ও সকাল ৮টা-৯টার বাস ছাড়েনি। তখন সেসব বাসের আসন নেওয়ার জন্য মাইকে যাত্রীদের বলা হচ্ছিল।

হেদায়েত কিছু সময় পরিস্থিতি বুঝে সায়েদাবাদের দিকে হাঁটতে শুরু করেন। পথে পথে সিলেট-হবিগঞ্জ-ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি-ফেনী-নোয়াখালী- লক্ষ্মীপুরসহ বিভিন্ন গন্তব্যের পরিবহনের কাউন্টার। কাউন্টারগুলোতে অসংখ্য যাত্রীর অপেক্ষা। সায়েদাবাদে যেতেই যেন মনে হয় মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারের নিচে জনপথ মোড় ঘিরে জনসমাবেশে বসেছে। কোনো কাউন্টারেই তিল ধারণের ঠাঁই নেই। কিছু যাত্রী আগেই টিকিট নিশ্চিত করে গাড়ির অপেক্ষায়, বাকিদের টিকিট চাই। কিন্তু কাউন্টারের কর্মীদের উত্তর, ‘টিকিট নেই, গাড়িও নেই!’

বরিশাল-পিরোজপুর-পটুয়াখালী-খুলনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী সার্বিক, রাজীব, কুয়াকাটা এক্সপ্রেস, বনফুলসহ বিভিন্ন পরিবহনের কাউন্টারে যাত্রী দেখা গেলেও টিকিট বিক্রি করতে দেখা যায়নি। কাউন্টারের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবার আগেই সব বুকিং হয়ে গেছে, এজন্য আর এখন টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে না। দুই-একটি পরিবহনের এতো গাড়িও নেই। কুয়াকাটা এক্সপ্রেসের হাসান নামের এক কর্মী বলেন, পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের ফলে ফেরি হয়ে চলাচলকারী বেশিরভাগ যাত্রী এবার সরাসরি বাসে বাড়ি যাচ্ছেন, তাই এবার এমন চাপ।

jagonews24

হেদায়েত যখন টিকিটের জন্য এদিক-ওদিক খোঁজ নিচ্ছিলেন, তখন ভিন্ন রুটে খ্যাপে যাত্রী পরিবহন করা একটি গাড়ির কর্মীরা তাকে ডাকতে থাকলেন, ‘এই ভাই আসেন, চট্টগ্রাম ৭০০!’ হেদায়েত তখন বলেন, ‘আমি তো চৌদ্দগ্রাম যাবো।’ হেদায়েতকে তখন জানানো হয়, যেখানেই যান ৭০০ টাকা দিতে হবে। অথচ অন্য সময়ে স্টার লাইনের গাড়িতে তিনি চৌদ্দগ্রাম যেতেন ৩২০ টাকায়।

এতদূর হেঁটে ক্লান্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত দ্বিগুণেরও বেশি ভাড়ায় ওই গাড়িতে চড়ে বসেন হেদায়েত। নাম অন্তর পরিবহন, চলে ঢাকা-গাইবান্ধা রুটে। তবে ঈদের সময় লাভজনক হওয়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটেই খ্যাপ মারে বেশি তারা। ১০-১৫ মিনিটের মধ্যেই ৪৫ আসনের গাড়ি পূর্ণ হলে গন্তব্যে ছোটে বাসটি। সায়েদাবাদ থেকে হানিফ ফ্লাইওভার পেরিয়ে সাইনবোর্ড এলাকায় পৌঁছাতেই দেখা যায় যানজট। গাড়ি এক মিনিট সামনে এগোয় তো, ১৫ মিনিট বসে থাকে। পাঁচ মিনিট এগিয়ে যায় তো, আটকে থাকে ৩০ মিনিট। সাইনবোর্ড থেকে মেঘনা সেতু এলাকা পার হতে ৩০ মিনিটের বেশি না লাগলেও এমন জটের কারণে আজ লাগলো আড়াই ঘণ্টার মতো। পরে দেখা যায়, মেঘনা সেতুর আগে ঢাকামুখী অংশে একটি ট্রাক উল্টে আছে, যার জের পড়েছে গোটা সড়কে। যদিও ট্রাকটি সরিয়ে নিতে ঘটনাস্থলে তৎপর দেখা যায় ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তাদের।

মেঘনা সেতু পার হওয়ার পর অবশ্য রাস্তা কিছুটা স্বস্তি দিতে থাকে। তবে খ্যাপে যাত্রী টানা পরিবহনে যে ভোগান্তি পোহাতে হয়, সেটা এড়ানো গেলো না। হকার ওঠানামা, বিরতির নামে দীর্ঘসময় ক্ষেপণ আরও দীর্ঘ করেছে ঈদযাত্রাকে। সাধারণ সময়ে যেখানে বাসা থেকে সকাল ৮টায় বের হলে ১২টার আগেই চৌদ্দগ্রাম নেমে যেতে পারতেন, সেখানে শুক্রবার হেদায়েতের গন্তব্যে নামতে নামতে বাজলো ৫টা। নামার সময় একটা হাসি দিয়ে বলে গেলেন, ‘এই ঈদযাত্রা আজীবন মনে রাখার মতো! ছুটির একটি দিনই গিলে নিলো!’

 




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Developed with by DATA Envelope
Top