গরিবের আটায় ধনীর থাবা
নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ১১ আগস্ট ২০২২ ১৫:৪২

আগের কয়েক দিনের ভ্যাপসা গরমের তুলনায় গতকাল বুধবার সকালের আবহাওয়া ছিল বেশ মনোরম। নিম্নচাপের প্রভাবে রাজধানীতেও ছিল বাতাসের ঝাপটা। বাতাসের বেগ সামাল দিতে এক হাতে মাথার ঘোমটা টেনে ধরেছিলেন পাপিয়া সুলতানা। অন্য হাতে ধরা ছিল বাজারের খালি ব্যাগ। সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর পান্থপথে দাঁড়িয়ে ইতি-উতি তাকাচ্ছিলেন তিনি। পাশের ফল বিক্রেতার কাছে জানতে চাইলেন ওএমএসের চাল-আটা নিয়ে ট্রাক কখন আসবে। ফল বিক্রেতার ভাবলেশহীন উত্তর আরও ঘণ্টা দুই পরে আসেন।
পাপিয়া গেলেন না। ফুটপাতেই বাজারের ব্যাগ বিছিয়ে বসে পড়লেন। আরামদায়ক বাতাসের মধ্যেও তার কপালে ছিল ঘাম। প্রায় শেষ শ্রাবণের আকাশের দিকে তাকিয়ে যেন মেঘের মধ্যে স্বস্তি খুঁজছিলেন।
পাপিয়া এই প্রতিবেদককে জানালেন, ওএমএসের ট্রাক থেকে আটা কিনতে চান। জীবনে কোনোদিন ওএমএসের লাইনে দাঁড়াননি। কিন্তু এবার আর পারলেন না। বাজারে যে আটা ৪৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে সেটাই ওএমএসের ট্রাকে বিক্রি হয় ১৭ টাকায়। প্রতিবেশীর কাছে এ গল্প শুনে সকাল সকালই ব্যাগ নিয়ে চলে এসেছেন পান্থপথ মসজিদের সামনে যেখানে ট্রাকটি দাঁড়ায়। খুব বেশি আটা থাকে না ট্রাকে। যেটুকু থাকে সেটাও তাড়াতাড়িই শেষ হয়ে যায় প্রতিবেশীর এ সতর্কবার্তার কারণেই আগেভাগেই চলে এসেছেন খাদ্য অধিদপ্তরের ট্রাক সেল কেন্দ্রে।
পাপিয়া সুলতানার জন্য প্রতিবেশীর সতর্কতা মিথ্যা নয়। সরকারের গুদামগুলোতে গমের জোগান নেই। তলানিতে থাকা গম দিয়ে ওএমএসের আটা দেওয়া হলে যারা চাকরিতে রেশন হিসেবে গম পান সরকার তাদের গম দেবে কীভাবে। পুলিশ, আনসার, বিজিবি, দুর্নীতি দমন কমিশন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থা ও বাহিনীর সদস্যরা রেশন হিসেবে গম পান। মাস শেষে তাদের গম দিতেই হবে।
খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতি মাসে তারা সাড়ে ১৭ হাজার টন গম রেশন হিসেবে দেন। কাজের বিনিময়ে খাদ্য, টেস্ট রিলিফ (টিআর), গ্রান্ড রিলিফ (জিআর), ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং (ভিজিএফ), ভালনারেবল গ্রুপ ডেভেলপমেন্ট (ভিজিডি) বা খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি কোনোটাই গুরুত্বপূর্ণ না রেশনের কাছে। রেশন নিয়ে যতটা না দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়, সেই তুলনায় অন্য কর্মসূচির আটা, চাল বা গম নিয়ে অতটা দুশ্চিন্তা করতে হয় না। কোনো কারণে পুলিশের রেশন না দিতে পারলে বা অন্য কোনো বাহিনীর রেশন না দিতে পারলে তা সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করবে। ওএমএসের আটায় কোনো ঝামেলা নেই। গম থাকলে দেওয়া হবে, না থাকলে দেওয়া হবে না।
তারা আরও জানিয়েছেন, চাকরিজীবীদের নিরবচ্ছিন্নভাবে রেশন হিসেবে গম দিতে গরিবের ওএমএসের আটা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ওএমএসে আটার বরাদ্দ ২ হাজার কেজি থেকে কমিয়ে ১ হাজার কেজি করা হয়েছিল। গত ৬ জুলাই তা ৫০০ কেজিতে নামিয়ে আনার নির্দেশনা দেয় খাদ্য মন্ত্রণালয়। শুধু তাই নয়, আগে ঢাকা মহানগরীতে ১৪৭টা ওএমএসের দোকান ছিল। সেটা কমিয়ে ১০০টি দোকানে নামিয়ে আনা হয়। অপর এক আদেশে ট্রাকের সংখ্যা ৩০টা থেকে কমিয়ে ২০টি নির্ধারণ করা হয়। ঢাকা মহানগরীর পাশাপাশি শ্রমঘন চার জেলায়ও ওএমএস পরিচালনা করা হয়। এরমধ্যে নারায়ণগঞ্জে ২৫, নরসিংদীতে ১৫, গাজীপুরে ৩০টি দোকানের মাধ্যমে ওএমএস পরিচালনা করা হয়। ঢাকার ধামরাই, সাভার, আশুলিয়া ও কেরানীগঞ্জে মোট ৩০টি ওএমএস কেন্দ্র পরিচালনা করা হয়।
এক প্রশ্নের জবাবে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘আমরা কম গমের কারণে ওএমএসে আটা কমাইনি। সরকারের গুদামে পর্যাপ্ত গম রয়েছে। মোট খাদ্যশস্যের পরিমাণও গত বছরের এই সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।’
গত সোমবার সরকারের গুদামে গমের মজুদ ছিল ১ লাখ ৫১ হাজার টন। গত বছরের এই দিনে সরকারের গমের মজুদ ছিল ২ লাখ ২৯ হাজার টন। তবে চালের মজুদ গত বছরের চেয়ে প্রায় চার লাখ টন বেশি।
খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘গমের মজুদ তলানিতে নয়। গম কম থাকার কারণে ওএমএসে আটা কম দেওয়া হচ্ছে না। আটার চাহিদা কম থাকায় আটা কমানো হয়েছে।’
অপর এক প্রশ্নের জবাবে মহাপরিচালক বলেন, বুলগেরিয়া থেকে গম আনার চুক্তি হয়েছে। আপাতত ১ লাখ টন আনা হচ্ছে, প্রয়োজনে আরও আনা হবে।
ইউরোপে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সরকার বিকল্প গমের বাজার খুঁজছে। নানা কারণে বিকল্প বাজার হাত ফসকে যায়। সরকার এবং বেসরকারি আমদানিকারকরা গমের জন্য ভারতের দিকে ঝুঁকলেও এখনো সেখান থেকে কোনো ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়নি। তাদের প্রতিশ্রুত দেড় লাখ টন গম এখানো পায়নি বাংলাদেশ সরকার। বেসরকারি আমদানিকারকরাও ভারত থেকে গম আমদানি করতে পারছেন না। বিকল্প বাজার হিসেবে কানাডা, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়ার কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত ফলদায়ক কিছু হচ্ছে না।
একদিকে সরকারিভাবে গমের আমদানি বন্ধ। অন্যদিকে বেসরকারিভাবেও আমদানি কমেছে আশঙ্কাজনকভাবে। গত ১ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত সরকারিভাবে একমুঠো গমও আসেনি। বেসরকারিভাবে এসেছে মাত্র প্রায় ৪৩ হাজার টন। আগের পুরো অর্থবছরে সরকারিভাবে গম এসেছিল ৫ লাখ ৪৬ হাজার টন এবং বেসরকারিভাবে ৩৪ লাখ ৬৫ হাজার টন।
দেশে জ¦ালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব কিছুর দাম বেড়েছে। ভর্তুকি কমাতে বাড়ানো হয়েছে সারের দাম। আগে থেকেই ছিল দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা। চালের মজুদ ভালো হলেও সরকারের গমের মজুদ কমে গেছে। নীতিনির্ধারকরা চাচ্ছেন কোনোভাবেই যেন খাদ্যদ্রব্যের দাম আর না বাড়ে। গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী খাদ্য পরিস্থিতি জানতে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার, খাদ্য সচিব মো. ইসমাইল হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তার দপ্তরে তলব করেছিলেন। সেখানে পুরো খাদ্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয় বলে জানা গেছে।
সরকার বিদেশ থেকে গম আনে। কখনো কখনো অভ্যন্তরীণ বাজার থেকেও কিছু গম পাওয়া যায়। সেই গম সরকারের আটা ও ময়দা মিলে ভাঙানো হয়। সরকার যে পরিমাণ গম সংগ্রহ করে তার পুরোটা রাজধানীর পোস্তগোলা সরকারি আধুনিক ময়দা মিলে ভাঙানো যায় না। এসব গম বেসরকারি মিলের মাধ্যমে আটা-ময়দা করা হয়।
কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, সরকারের সদিচ্ছা থাকলে এ মিলেই আরও বেশি গম আটা-ময়দা করা যায়। কিন্তু একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলটাকে পুরো মাত্রায় কাজে লাগান না। তারা মিলটাকে নানা অনিয়মের কাজে ব্যবহার করেন। অভিযোগ উঠেছে, গমের ভুসি বিক্রি করতে অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়। গম ভেজানোর ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ভাঙাতে হলে গম ৮ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। একশ টন গম ভেজালে ১০২ টন হয়। কিন্তু কাগজপত্রে ১০০ টন গমই দেখানো হয়। এছাড়া মিলের বস্তা কেনায়, প্যাকেটজাত করতে ফয়েল পেপার কেনা, গম থেকে সৃষ্ট ভুসি বিক্রিতে এবং ভুয়া শ্রমিকের হাজিরা দেখিয়ে আর্থিক অনিয়ম হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
যদিও এসব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন পোস্তগোলা সরকারি আধুনিক ময়দা মিলের চিফ মিলার সাজেদুর রহমান। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি গতকাল জানান, এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। কিছু কর্মকর্তাকে বিভিন্ন অপরাধে বরখাস্ত করা হয়েছে। তারা এসব বিষয় রটাতে পারে।
তবে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মিলটি ২০১৭ সালে প্রাইভেট-পাবলিক পার্টনারশিপে (পিপিপি) পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়। এ সংক্রান্ত কাজ অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার পর স্থগিত হয়ে যায়। পিপিপির আওতায় দেওয়া হলে মিলটির সক্ষমতার পুরোটাই ব্যবহার করা যাবে। একইসঙ্গে মিলটি থেকে নির্দিষ্ট হারে মুনাফা পাবে সরকার। সরকারের কাজ ব্যবসা করা না। বরং ব্যবসাসহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা। সেই সূত্রে মিলটি আবারও পিপিপিতে দেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে।
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: